আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ। পুরনো বছরের জীর্ণতা, গ্লানি ও শোককে বিদায় জানিয়ে শুরু হচ্ছে নতুনের পথচলা। স্বাগত ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। নানা আয়োজনে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে দেশ জুড়ে চলছে উৎসবের আমেজ। চৈত্র সংক্রান্তি ও ঐতিহ্যবাহী হালখাতা আয়োজনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে গতকাল বিদায় জানানো হয়েছে পুরনো বছরকে। আজ সকালের সূর্যোদয়ের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হলো নতুন বছরের।

নতুন আলো, নতুন সম্ভাবনার হাতছানিতে নববর্ষকে স্বাগত জানালো দেশবাসী। বাংলা নতুন বছরে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বরাবরের মতোই এবারো পহেলা বৈশাখের বড় আয়োজনটি হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

২০১৬ সালে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পাওয়া চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রার সুতিকাগার যশোরে আজ সকালে আবারও ঢাক ঢোল বাদ্যের সাথে শোভাযাত্রা বের হয়। বাংলা ১৩৯২ বঙ্গাব্দে, অর্থাৎ ১৯৮৫ সালে যশোরের চারুপীঠ বর্ষবরণে শোভাযাত্রা বের করে। এর পরের বছর ১৩৯৩ বঙ্গাব্দে মঙ্গল শোভাযাত্রা উদযাপন পর্ষদের ব্যানারে যশোরের সকল সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমম্বয়ে দল-মত নির্বিশেষে বের হয় ‘মঙ্গল’ শোভা যাত্রা। যশোরের সেই আয়োজকদের উদ্যোগেই এর দু’বছর পর ঢাকায় চারুকলা ইন্সটিটিউট বের করে মঙ্গল শোভাযাত্রা। যার স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। অথচ এর সূতিকাগার যশোরের মঙ্গল শোভাযাত্রার স্বীকৃতি মেলেনি আজও।

সেদিনকে স্মরণ করেই আজ সকালে সবার সমন্বয়ে বের হয় বর্ণাঢ্য শোভা যাত্রা। এছাড়াও এবার পৌরপার্কে যশোর উদীচীর ঐতিহ্যবাহী প্রভাতী অনুষ্ঠান ৫০ বছরে পা দিচ্ছে। এ অনুষ্ঠানসহ উৎসব হবে মুসলিম একাডেমি, টাউন হল মাঠ, জেলা পরিষদ মিলনায়তন চত্বর, ডাক্তার আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপ্যাল কলেজ মাঠ, নবকিশলয় স্কুল প্রাঙ্গণসহ বিভিন্ন স্থানে। সেসব প্রাণের উৎসবে মেতে উঠবে যশোরের সর্বস্তরের মানুষ।

ঢাকার রমনার বটমূলে সেই বর্ষবরণ উৎসবে মেতে উঠবে। নববর্ষ উপলক্ষে বের হবে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, যেখানে লোক ঐতিহ্য ও স্বকীয়তাকে ধারণ করে বৃহৎ পরিসরে সর্বজনীন অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শোভাযাত্রার থিম ও মোটিফে ফুটে উঠবে আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতি। বাঁশ, কাঠ ও রঙিন কাগজে নির্মিত বিশাল বাঘ, হাতি, ময়ূর এবং মা-শিশুর প্রতিকৃতি শোভাযাত্রাকে দেবে এক অনন্য মাত্রা।

এই শোভাযাত্রার মূল বার্তা অশুভ শক্তির বিনাশ এবং কল্যাণময় আগামীর পথে যাত্রা। এবারের শোভাযাত্রায় ‘মোরগ, বেহালা, পায়রা, হাতি ও ঘোড়া’ এই পাঁচটি মোটিফ বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। লোকজ প্রতীকের ধারায় এগুলো যথাক্রমে শক্তি, সৃজন, শান্তি, গৌরব ও গতিময়তার প্রতীক হিসেবে বহুমাত্রিক তাৎপর্য বহন করে। প্রতিটি মোটিফেই প্রতিফলিত হবে বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গভীর অনুষঙ্গ। পাশাপাশি ৩৫ জন বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর পরিবেশনায় জাতীয় সংগীত, ‘এসো হে বৈশাখ’ এবং দেশাত্মবোধক গান শোভাযাত্রার আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে। এতে অংশ নেবে ২০০ জন শিক্ষার্থী, যারা বহন করবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা।

‘শান্তি, মানবতা ও সম্প্রীতি’- এই প্রতিপাদ্য নিয়ে রমনার বটমূলে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে পরিবেশন করবেন বর্ষবরণের গান, যা দীর্ঘদিন ধরেই এ দিনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। অন্যদিকে, উদীচী সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তোপখানা রোডে আড্ডা, গান, কবিতা ও নৃত্যের মাধ্যমে বর্ষবরণ করবে। বিকাল ৪টায় তাদের মূল আয়োজন অনুষ্ঠিত হবে। এবারের প্রতিপাদ্য-‘বৈশাখের রুদ্র-রোষে ধ্বংস হোক সামাজিক ফ্যাসিবাদ। নববর্ষের দিনে আজ কৃষি কার্ডের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমিসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন সারা দেশে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদ্যাপন করবে। এদিকে জাতীয় প্রেস ক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে নিরাপত্তা নিশ্চিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও র‌্যাব বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

আজ একদিনের বাঙালি সাজবার দিন নয়, সারাজীবন মনে-প্রাণে বাঙালি থাকার শপথ নেয়ার দিন আজ। সেই প্রত্যয়কে ঘিরেই, বাংলা নববর্ষে মহামিলনের এই আনন্দ থেকেই বাঙালি মাত্রই আজ ধর্মান্ধ অপশক্তির কূট-ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করার, আর কুসংস্কার ও কুপমন্ডুকতার বিরুদ্ধে লড়াই করার অনুপ্রেরণা নেবে, ঐক্যবদ্ধ হবে। নতুন বছর মানেই এক নতুন সম্ভাবনা, নতুন আশায় পথ চলা। তেমনি বুকভরা প্রত্যাশা নিয়ে নতুন উদ্যমে ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতি আজ আবার সোচ্চার হবে নতুন বাংলাদেশ দেখার। আজ মুখে মুখে যেমন উচ্চারিত হবে কবি গুরুর ‘এসো হে বৈশাখ’ তেমনি থাকবে বিদ্রোহী কবি নজরুলের সেই গান-‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল বৈশাখীর ঝড়’। এই সুরধ্বনির মধ্যদিয়েই বাঙালি পুরনো বছরের সকল অপ্রাপ্তি ভুলে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। এমন প্রত্যাশা আজ প্রাণের বৈশাখী উৎসবে।